আমাদের সংস্কৃতির উৎস

মনিরউদ্দীন ইউসুফ ।।

মনে রাখতে হবে যে, আমাদের সংস্কৃতির উৎস রাসূলুল্লাহ্‌র (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্মময় জীবন ও কুরআনের নির্দেশ।

জীবন থেকে যা দূরে নিয়ে যায়, কর্ম থেকে যা বিরত রাখে তা মুসলমানের সংস্কৃতি-চর্চার বহির্ভূত ব্যাপার। মুসলমানের সংস্কৃতি-চর্চায় থাকবে বিষয়বস্তুর এমন রূপায়ণ যা কর্মময় ও সদর্থক জীবনকে স্বীকার করে নেয়।

‘ইসলামে বৈরাগ্য নেই’ – রাসূলের এ কথাটির অর্থ এই নয় যে, জঙ্গলে যাওয়া মুসলমানের জন্যে অবিধেয়। এ কথার অর্থ হল জীবনের সকল ক্ষেত্রে মুসলমানকে তৎপর হতে হবে। বুঝতে হবে যে, দক্ষিণ মেরুর আবিষ্কার ও হিমালয়ের চূড়ায় আরোহণ এবং এই বিশ্বের রহস্যোদ্ধার কিংবা পৃথিবী চালানোর ভার অপরের হাতে ন্যস্ত করে দিয়ে নিষ্ক্রিয় জীবন যাপন করাই মুসলমানের জন্যে অবিধেয় ও মহা অন্যায়।

তাই আমাদেরকে উজ্জীবিত হতে হলে জীবন-স্বপ্নের স্বাপ্নিক হতে হবে। আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে এমন সব দায়িত্ব, যে দায়িত্ব পালন করলে পৃথিবীতে দারিদ্র্য থাকবে না; মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্বের অবসান হবে; বিশ্বের সকল মানুষ হবে মুসলমানের আপন। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়ে মুসলমান দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত করবে। তার সকল কর্মই হবে প্রগতির সহায়ক। এসব আমরা তখনই করতে পারবো, যখন দেখবো যে, সর্বপ্রকার কর্ম-দায়িত্ব ও প্রগতির উৎসই হলেন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং আর কুরআন সদর্থক ও প্রগতিশীল জীবনের দিকেই মানুষকে আহ্বান জানিয়েছে।

ফলে সংস্কৃতি-চর্চা মুসলমানের জন্যে শুধু মনোরঞ্জনের ব্যাপার অর্থেই পর্যবসিত হয়নি, সেটি তার জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে।

তাই রাসূলকে বা সত্যকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্যে মদীনার মেয়েরা বাদ্যসহ গান গেয়ে এগিয়ে এসেছিল। তাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফুল ও সুগন্ধী দ্রব্যকে এতো ভালোবাসতেন। তাই রাসূলের মহত্তম সাহাবীদের অনেকেই কবিতা রচনা করতেন। তাই নবীজীর হাদীসগুলি অনবদ্য মুক্তার মতো চিরযুগের সাহিত্যের নিদর্শন হয়ে আছে।

আজ মুসলমানের সংস্কৃতি-চর্চা, সে কারণেই, আল্লাহ্‌র রাসূল থেকে প্রেরণা লাভের জন্যে উন্মুখ হবে; প্রাচীনপন্থী ধর্ম ব্যবসায়ীদের ‘বিরাগকে’ অনুসরণ করবে না। মুসলমান আজ নাটককে দেখবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাস্তব জীবনের এক সংহত সত্য রূপায়ণ হিসেবে; তারা ফ্রয়েডের অনুসরণে জীবনকে যৌন-অবদমনের প্রেক্ষাগৃহ রূপে প্রত্যক্ষ করতে চাইবে না। তাদের কবিতা ও উপন্যাস মনোরঞ্জনের বা বিশৃঙ্খল উপাদানের স্তূপ না হয়ে হবে বাস্তব জীবনের এমন সমালোচনা, যা আমাদেরকে সামনের দিকে চলবার প্রেরণা যোগায়। তার শিল্প হবে জীবনকে উদ্বোধিত করার উপায়।

এইভাবে মুসলমান তার সংস্কৃতি-চর্চার মাধ্যমে তার স্রষ্টা নির্ধারিত কর্মীরূপকে ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তার সংস্কৃতি-চর্চা কোনোভাবেই জীবনের নৈরাশ্যপূর্ণ ও নঞর্থক দিককে প্রশ্রয় দেবে না।

তাই রেডিও টিভি থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র, রঙ্গমঞ্চ – সর্বত্র থাকবে আমাদের দায়িত্বপূর্ণ গতিবিধি। আমরা বুঝবো, একমাত্র ‘মিথ্যা’ ব্যতীত আমাদের পরিত্যাজ্য কিছু নয়।

আমরা সেই বাণীধারক, আমরা সেই মহান পুরুষের উম্মত, যাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল ‘সত্য এসেছে, মিথ্যা দূরীভূত হয়েছে; মিথ্যা নস্যাৎ হওয়ারই বস্তু।’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।