তাতারীদের ইসলাম বরণ

মাওলানা মুহাম্মাদ কালীম সিদ্দিকী ।।


দাওয়াতের উদ্দেশ্যে মুসলমানরা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী। একজন প্রকৃত মুসলমান যখন ব্যবসার বাহানায় সফর করেছে তো দেশের পর দেশ কোনো অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়া জয় করে নিয়েছে।

আপনি হয়তো শুনে থাকবেন চেঙ্গিস ও তাতারীদের কথা। অত্যাচারী ও জালিমশাহী, যাদের রাজ্য সীমানায় মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। যারা মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল। মুসলমানদের মাথার খুলি দিয়ে মিনার তৈরি করেছিল। যাদের সম্বন্ধে বলা হতো, ‘সকল কথাই বিশ্বাস করো; কিন্তু যদি বলা হয়, তাতারীরা পরাজিত হয়েছে, তাহলে তা কখনো বিশ্বাস করো না।’

এক মুসলিম দরবেশ, ব্যবসায়ী। যিনি ব্যবসার বাহানায় পুরো দুনিয়ায় দাওয়াতকে আপন লক্ষ্য স্থির করেছিলেন। তাঁর নাম মোল্লা জামালুদ্দীন।

তিনি তাতারীদের রাজ্য সীমানা অতিক্রম করছিলেন। তাতারী সেনারা তাঁকে গ্রেফতার করলো। তাঁকে তাতারী যুবরাজ তুঘলক তাইমূরের দরবারে পেশ করা হল। সে তাঁকে হত্যার নির্দেশ দিলো।

হত্যার পূর্বে যুবরাজ তাঁকে অপদস্থ করার জন্য সামনে বসা একটি কুকুরের দিকে নির্দেশ করে বললো, বলতো, এই কুকুরটি উত্তম না তুমি?

আল্লাহর এই বান্দা দাওয়াতের সুযোগ পেয়ে গেলেন। তিনি বললেন, এই প্রশ্নের সমাধান এক্ষণই সম্ভব নয়। আমার মৃত্যু যদি ঈমানের ওপর হয়, তো আমি এই কুকুর হতে বহুগুণ উত্তম। আর খোদা না করুন যদি আমার মৃত্যু ঈমানের ওপর না হয়, তবে এই কুকুরটি উত্তম।

যুবরাজ বললো, ঈমান কী?

মোল্লা জামালুদ্দীন ঈমানের কেবল বাহ্যিক নয়, তার হাকীকতও জানতেন। ঈমানের পরিচয় তিনি এমন দরদভরা ভাষায় পেশ করলেন যাতে তুঘলক তাইমূর সীমাহীন প্রভাবিত হলো। সে বললো, তুমি যা বলেছো, তা সবই সত্য, আমি তা অন্তর দিয়ে গ্রহণ করলাম। তবে তা এখন প্রকাশ করার উপযুক্ত সময় নয়। তাঁর হাতে একটি চিরকুট লিখে দিল। বললো, যখন আপনি জানবেন আমার রাজ-অভিষেক হয়েছে, তখন চিরকুটটি নিয়ে আপনি আসবেন। অতঃপর যুবরাজ তাঁকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বিদায় জানালেন।

ঘটনাক্রমে তুঘলক তাইমূরের অভিষেকের পূর্বেই মোল্লা জামালুদ্দীন পরলোকগত হলেন। ইন্তেকালের মুহূর্তে স্বীয় পুত্র মোল্লা নিজামুদ্দীনকে ডাকলেন। তাকে বললেন, তুমি যখন জানবে তুঘলক তাইমূরের অভিষেক হয়েছে, তখন এ পত্রটি নিয়ে তার নিকটে যাবে এবং তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে।

যখন তিনি জানতে পারলেন, তুঘলক তাইমূরের অভিষেক হয়ে গেছে, তখন তিনি বাদশাহর কাছে গেলেন। তবে বাদশাহর দরবারে পৌঁছতে পারলেন না। বাধ্য হয়ে তিনি বাদশাহর শোবার ঘরের অবস্থান জেনে নিয়ে মহলের বাহিরে একদিন সাহরীর সময়ে সজোরে আযান দিলেন।

আযানের ধ্বনি শুনে বাদশাহ তাকে গ্রেফতারের হুকুম করলেন। গ্রেফতার করে যখন তাঁকে দরবারে নিয়ে আসা হলো, সে সময় তিনি পত্রটি দেখালেন। বাদশাহ খুবই আনন্দিত হলেন। বললেন, আপনি যথাসময়েই এসেছেন।

তিনি তাঁর মন্ত্রীকে নিয়ে পরামর্শে বসলেন। মন্ত্রী বললেন, দু’বছর পূর্বেই আমি ইসলাম বরণ করেছি। আপনার ভয়ে আমি গোপন রেখেছিলাম।

তুঘলক তাইমূর বললেন, ফরমান জারি করা হোক, আজ থেকে আমাদের রাষ্ট্রধর্ম হবে ইসলাম। আর এ রাজ্যে থাকা সকল মানুষের উচিত তারা যেন ইসলাম কবুল করে।

ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, এর ফলে তাতারী জাতি সকলেই মুসলমান হয়ে গেল। পরবর্তীতে এই জাতির মাঝে বহু দীনদার, মুত্তাকী বাদশাহ হয়েছে। হিন্দুস্তানের মোঘল বাদশাহরা এদেরই বংশধর। যারা ইসলামের বহু খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন।

একজন মুসলিম বণিক দা’ঈর অন্তরে ঈমান ও ইসলামের কদর ছিল। তাঁর অন্তরে এটা বদ্ধমূল ছিল যে, ঈমান ছাড়া ইনসানের চেয়ে কুকুর উত্তম। যিনি তাঁর অস্তিত্বকেই দাওয়াতের বাস্তব প্রতিচ্ছবি বানিয়েছিলেন। তিনি কেবল তাতারী জাতিকে জয় করেননি; বরং তাদেরকে ইসলামের দা’ঈ, প্রেমিক এবং গুণগ্রাহীতে পরিণত করলেন।

আজও যদি মুসলমানরা এ মোবারক কাজকে জীবনের ব্রত হিসাবে বেছে নেয়, তো আল্লাহ্‌ তা’আলা ভীষণ অত্যাচারী শত্রুকেও ইসলামের ভক্তে পরিণত করে দিতে পারেন। তবে শর্ত হলো, দিলে ঈমানের এমনই কদর থাকা চাই যে, ঈমানবিহীন মৃত্যুর ওপর কুকুরের মৃত্যুকে অগ্রাধিকার দেয়। আর দাওয়াতকে নিজের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করে।

অনুবাদ : মাওলানা মুজীবুর রহমান কাসেমী
সম্পাদনা : মাওলানা নাজমুদ্দীন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।