পিঁপড়াদের দাওয়াতি তৎপরতা এবং আমরা

মাওলানা মুহাম্মাদ কালীম সিদ্দিকী ।।

ভাইয়েরা আমার! আমরা সবাই ‘ইনসান’ বা মানুষ। ‘ইনসান’ শব্দটি ‘উন্‌স’ শব্দ থেকে নির্গত। অন্তরের ভালবাসা, সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতার নাম ‘উন্‌স’। অপরের প্রতি সমবেদনা, শুভাকাঙ্ক্ষা এবং তাকে ধ্বংস ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করার অনুভূতিই ‘উন্‌স’।

এরূপ অনুভূতি যার অন্তরে বিদ্যমান সে-ই ইনসান বা মানুষ। এ জযবা আল্লাহ্‌র নিকট অতি প্রিয়।

আপনারা ভেবে দেখুন! পিঁপড়া একটি ক্ষুদ্র ও নগণ্য সৃষ্টি। কোনো ক্ষুদ্রতম বস্তুর উপমায় পিঁপড়ার নাম আসে। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র ও নগণ্য প্রাণী পিঁপড়া। আপনারা জানেন, হযরত সুলাইমান আলাইহিসসালাম-এর বাহিনী যখন পূর্ণ শৌয-বীর্য আর প্রবল প্রতাপের সাথে রাস্তা অতিক্রম করছিল, পিঁপড়াদের সরদার তখন স্বজাতির কল্যাণে সুলাইমান আলাইহিসসালাম-এর সেনাদের পদপিষ্ট হওয়া থেকে তাদেরকে বাঁচানোর জন্য এ আহ্বান জানাল –

یّٰۤاَیُّہَا النَّمۡلُ ادۡخُلُوۡا مَسٰکِنَکُمۡ ۚ لَا یَحۡطِمَنَّکُمۡ سُلَیۡمٰنُ وَ جُنُوۡدُہٗ ۙ وَ ہُمۡ لَا یَشۡعُرُوۡنَ

“হে পিপীলিকা বাহিনী! তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ করো, যেন সুলাইমান এবং তাহার বাহিনী তাহাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদিগকে পদতলে পিষ্ট করিয়া না ফেলে।” [সূরা নামল: ১৮]

ভাবুনতো, স্বজাতিকে রক্ষা করার জন্য তাদের কল্যাণকামিতায় পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র এই প্রাণী যখন একটিমাত্র ডাক দিলো, তখন আল্লাহ্‌র কাছে তা এতই পছন্দনীয় হলো যে তিনি তাঁর পবিত্র কালামে বিষয়টি উপস্থাপন করলেন। যে কালামের বড়ত্ব, মহত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে খোদ কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে –

لَوۡ اَنۡزَلۡنَا ہٰذَا الۡقُرۡاٰنَ عَلٰی جَبَلٍ لَّرَاَیۡتَہٗ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنۡ خَشۡیَۃِ اللّٰہِ ؕ وَ تِلۡکَ الۡاَمۡثَالُ نَضۡرِبُہَا لِلنَّاسِ لَعَلَّہُمۡ یَتَفَکَّرُوۡنَ

“যদি আমি এই কুরআন পর্বতের উপর অবতীর্ণ করিতাম তবে তুমি উহাকে আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত এবং বিদীর্ণ দেখিতে। আমি এই সমস্ত দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য, যাহাতে তাহারা চিন্তা করে।” [সূরা হাশর: ২১]

শান- শওকতভরা কুরআনুল কারীমের একটি সূরার নাম হয়ে গেল ‘পিঁপড়া’-এর নামে। সূরার নামটি ‘নামল’, যার অর্থ পিঁপড়া। বরং পিঁপড়ার মুখে এই দরদভরা আওয়ায দিয়ে, একটি সূরা নাযিল করে আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন আমাদের প্রতি সেই অভিপ্রায়কেই প্রকাশ করতে চাইলেন, স্বজাতির দরদে দরদী হওয়াটা তাঁর কাছে কতইনা প্রিয়। এই সহমর্মিতার বড় কদর রয়েছে আল্লাহ্‌র দরবারে।

আবার কুকুরের কথাই ধরুন। কুকুর খুবই প্রভুভক্ত প্রাণী। কিন্তু তার বদভ্যাস হলো- তার বসবাসের সীমানায় অন্য কারো প্রবেশ কিংবা তার সাথে আরেকটি কুকুরের আহার-বিহারকে কোনভাবেই সে সহ্য করে না। কুকুরের সীমাহীন প্রভুভক্তি সত্ত্বেও, মানুষের নিকটে থাকার উপযোগী পর্যাপ্ত গুণ বিদ্যমান থাকার পরও কুকুরের অসহমর্মিতার দোষ মানুষের ভেতর সংক্রমিত হবার আশঙ্কা থাকায় ইসলামে কুকুর পালনে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এমনকি ইসলাম বলে, যে ঘরে কুকুর থাকে, নেকীর ফেরেশতা সে ঘরে প্রবেশ করেন না।

ব্যাপারটা দেখুন, মানবতার প্রতি সহমর্মিতা ও কল্যাণকামিতা আল্লাহ্‌র কত পছন্দ! আর অপরের অকল্যাণ চাওয়াটা আল্লাহ্‌র কাছে কতইনা অপছন্দনীয়! বিশেষত জাতি যখন কোনো ক্রান্তিকাল ও বিপদমুহূর্ত অতিক্রম করে। এসময় জাতির ব্যথা ও যন্ত্রণা উপশমের উপায় তালাশ করা এবং বিপদ ও যন্ত্রণাদায়ক মুসীবত থেকে উদ্ধারকার্যে সচেষ্ট হওয়া আল্লাহ্‌র কাছে কত যে প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য, তা অনুমান করা মুশকিল।

বর্তমান যুগে যখন গোটা মানবজাতি অশান্তি ও অস্থিরতায় নিমজ্জিত, বিশেষত মুসলিম উম্মাহ পৃথিবীর সকল দেশেই সীমাহীন পেরেশান; অসহায়ত্ব ও দুরবস্থার শিকার। মুসলিম উম্মাহ্‌কে এ অসহায়ত্ব ও দুরবস্থা থেকে মুক্ত করা এক মহৎ কাজ। আল্লাহ্‌র দরবারে তা অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও প্রশংশনীয়।

অনুবাদ : মাওলানা মুজীবুর রহমান কাসেমী

সম্পাদনা : মাওলানা নাজমুদ্দীন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।