বিশ্বের দরবারে রাসূল মুহাম্মাদ

।। তাঁর ওপর আল্লাহর ঝরুক সালাম ।।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ।।

শেষ নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্বে যত নবী বা ধর্মপ্রবর্তক এসেছেন, তাঁরা তাঁদের স্বজাতির জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। এমনকি মহাত্মা যীশু খ্রিস্ট পর্যন্ত বলেছেন, “I am not sent, but unto the lost sheep of the house of Israel.” (Mathew, 15 : 24) অর্থাৎ – “আমি ইসরাইল বংশের হারানো মেষদের জন্য প্রেরিত হয়েছি, ইহা ভিন্ন নহে।” কিন্তু হযরত মুহাম্মাদ (তাঁর ওপর আল্লাহর ঝরুক সালাম) আল্লাহর আদেশে ঘোষণা করেছেন –

قُلۡ یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ جَمِیۡعَۨا الَّذِیۡ لَہٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ یُحۡیٖ وَ یُمِیۡتُ ۪

অর্থাৎ, “বলো – হে মানুষ, নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লাহর রাসূল বা প্রেরিত দূত, (সেই আল্লাহর) যিনি আকাশসমূহ আর পৃথিবীর রাজত্বের মালিক। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান।” (সূরা আল-আ’রাফ, ৭ : ১৫৮)

তাঁর সম্বন্ধে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত সভ্য ভাষায় জীবনী লেখা হয়েছে। এই সমস্ত জীবনী-লেখকগণের অধিকাংশ খ্রিস্টান। কিন্তু তাদেরকে রাসূল মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহত্ত্ব স্বীকার করতে হয়েছে। তবে যারা বিদ্বেষ-বশে লেখনী ধারণ করেছেন, তাদের কথা স্বতন্ত্র। আঁ-হযরতের এই সমস্ত জীবনী সম্বন্ধে সমালোচনা প্রকাশ করা মুসলমান সমাজের কর্তব্য। আমি এখানে কয়েকজন মুসলিম এবং কয়েকজন অমুসলমান লেখকের রাসূলুল্লাহ সম্বন্ধে প্রশংসা উক্তির অনুবাদ দিচ্ছি।

নবী মুহাম্মাদ (তাঁর ওপর আল্লাহর ঝরুক সালাম) সম্পর্কে ফরাসি লেখক আলফ্রেড দে লা মার্টিন (Alfred de Lamartine) লিখেছেন :

“দার্শনিক, বক্তা, ধর্মপ্রচারক, যোদ্ধা, আইন-রচয়িতা, ভাবের বিজয়কর্তা, ধর্মমতের ও প্রতিমাবিহীন ধর্মপদ্ধতির কুড়িটি পার্থিব রাজ্যের এবং একটি ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা দেখ সেই মুহাম্মাদকে (তাঁর ওপর আল্লাহর ঝরুক সালাম)। মানুষের মহত্বের যতগুলি মাপকাঠি আছে তা দিয়ে মাপলে, কোনো লোক তাঁর চেয়ে মহত্তর হতে পারে?” (তুর্কি ইতিহাস, ১ম খণ্ড)

বিশ্ববিখ্যাত ফরাসী বীর নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (Napoleon Bonaparte) তাঁর সম্বন্ধে বলেন :

“মুহাম্মাদ ছিলেন এইরূপ রাজা। তিনি তাঁর স্বদেশবাসিগণকে তাঁর চতুষ্পার্শে সমবেত করেন। অল্প কয়েক বৎসরের মধ্যে তাঁর মুসলমানগণ পৃথিবীর অর্ধাংশ জয় করেন। তাঁরা ১৫ বৎসরে অধিকতর সংখ্যক মানুষকে মিথ্যা দেবদেবী থেকে ছিনিয়ে আনেন, অধিকতর সংখ্যক দেবমূর্তি ধূলিসাৎ করেন, অধিকতর সংখ্যক মন্দির ধ্বংস করেন, যা পনেরোশত বৎসরেও মূসা এবং যীশু খ্রিস্টের অনুসারীগণ করতে পারেননি। মুহাম্মাদ ছিলেন একজন মহাপুরুষ।” (Bonaparte L’ Islam, পৃষ্ঠা ১০৯)

জর্জ বার্নার্ড শ বলেন :

“মধ্যযুগের খ্রিস্টীয় ধর্মযাজকগণ নিজেদের অজ্ঞতা কিংবা গোঁড়ামির কারণে ইসলামকে ঘোর কৃষ্ণবর্ণে চিত্রিত করেছেন। বস্তুত তাদেরকে মানুষ মুহাম্মাদ এবং তাঁর ধর্মকে ঘৃণা করতে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। তাদের কাছে মুহাম্মাদ ছিলেন দাজ্জাল (Antichrist)। আমি তাঁকে অধ্যয়ন করেছি; আশ্চর্য মানুষ তিনি! আমার বিশ্বাস, তাঁকে দাজ্জাল না বলে বরং মানবজাতির ত্রাণকর্তা বলাই কর্তব্য। আমি বিশ্বাস করি, যদি তাঁর মতো কোনো ব্যক্তি আধুনিক জগতের একনায়কত্ব গ্রহণ করতেন, তবে তিনি এর সমস্যাগুলি এরূপভাবে সমাধান করতে পারতেন, যাতে বহু আকাঙ্ক্ষিত শান্তি ও সুখ এতে আনয়ন করতে সমর্থ হতেন।”

পাদরী বস্ওয়ার্থ স্মিথ বলেন :

“ইতিহাসের একটি সম্পূর্ণ অভূতপূর্ব সৌভাগ্য যে মুহাম্মাদ একাধারে তিনটির স্থপতি – একটি জাতি, একটি সাম্রাজ্য এবং একটি ধর্ম।”

টমাস কার্লাইল (Thomas Carlyle) বলেছেন :

“আরবজাতির পক্ষে এ ছিল আঁধার থেকে আলোর জন্ম। … এক গরীব রাখালের জাতি, পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে তারা মরুভূমিতে সকলের অজ্ঞাতভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিল; এক বীর নবীকে উপর থেকে পাঠান হলো তাদের কাছে এমন কথার সঙ্গে, যা তারা বিশ্বাস করতে পারে। দেখ তো, অজ্ঞাত হচ্ছে জগদ্বিখ্যাত, ক্ষুদ্র হচ্ছে জগদ্বৃহৎ। তারপর এক শতাব্দীর মধ্যে এদিকে গ্রানাডায় আর ওদিকে দিল্লীতে – বীর্যে, ঐশ্বর্যে আর প্রতিভার আলোকে আলোকিত হয়ে সেই আরব বহু যুগ ধরে পৃথিবীর এক বড় অংশের উপর আলো দিচ্ছে।”

স্বামী বিবেকানন্দ বলেন :

“তারপর আসেন সাম্যের দূত মুহম্মদ। তুমি প্রশ্ন করো, তার ধর্ম কি ভালো? যদি তা ভালো না হয়ে থাকে, তবে কিরূপে বেঁচে থাকে? কেবল ভালোই বাঁচে, কেবল তা’ই টিকে থাকে। অপবিত্র লোকের জীবন কত কাল? পবিত্র লোকের জীবন কি দীর্ঘতর নয়? নিঃসন্দেহে; কারণ, পবিত্রতার শক্তি সৎস্বভাব শক্তি। ইসলাম কিরূপে বেঁচে রইলো? যদি তার শিক্ষায় কিছুই ভালো না থাকে? তাতে অনেক ভালো আছে। মুহম্মদ ছিলেন সাম্যের পয়গম্বর, মানুষের ভ্রাতৃত্বের পয়গম্বর, সমস্ত মানুষের ভ্রাতৃত্বের।”

মহাত্মা গান্ধী আঁ-হযরত (সা.) সম্বন্ধে বলেন :

“আমার দৃঢ়বিশ্বাস জন্মেছে যে, সে যুগের জীবনধারায় ইসলাম যে স্থান লাভ করেছিল, তা’ তরবারির বলে নয়। এ ছিল নবীর কঠোর সরলতা, সম্পূর্ণ আত্মবিলোপ, অঙ্গীকার পালনে একান্ত যত্নশীলতা, তাঁর বন্ধু ও অনুবর্তী জনগণের প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ, তাঁর সাহসিকতা, তাঁর নির্ভীকতা, আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর নিজের নিয়োজিত প্রচারকার্যের প্রতি একান্ত বিশ্বাস। তরবারি নয়, এই সকল গুণই সর্ববিষয়ে তাঁদিগকে সাফল্য দান করেছিল এবং সকল বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করতে সক্ষম করেছিল।”

শাহ আবদুল আযীয দেহলভী লিখেছেন :

“হে মোর সুন্দরতম! হে নর রতন।
চাঁদেরে দিয়েছে জ্যোতি তোমারই আনন।
অসম্ভব যথাযোগ্য প্রশংসা তোমার;
সংক্ষেপে, খোদার নীচে তোমারি আসন।”

ইমানুয়েল ডাস (Emmanuel Duetsch) বলেন :

“একটি পুস্তক, যার সাহায্যে আরবেরা মহান আলেকযান্ডার অপেক্ষা, রোম অপেক্ষা, পৃথিবীর বৃহত্তর ভূভাগ জয় করতে সমর্থ হয়েছিল, রোমের যত শতক বৎসর লেগেছিল তার জয় সম্পূর্ণ করতে, আরবের লেগেছিল তত দশক। এরই সাহায্যে সমস্ত সেমিটিক জাতির মধ্যে কেবল আরবেরাই এসেছিল ইউরোপে রাজারূপে, যেখানে ফিনিশীয়রা এসেছিল বণিকরূপে আর ইহুদিরা এসেছিল পলাতক কিংবা বন্দীরূপে।”

শায়েখ সাদী পেশ করেন :

বালাগাল ‘উলা বাকামালিহী,
কাশাফাদ্ দুজা বাজামালিহী,
হাসুনাত জামী’উ খিসালিহী,
সাল্লু ‘আলাইহি ওয়া আলিহী।।

করিলেন অত্যুন্নতি তিনি পূর্ণতায়,
নাশিলেন তমোরাশি সৌন্দর্য প্রভায়।।
মনোহর আহা! তাঁরি কার্য সমুদায়।
পাঠাও দরূদ সবে তাঁহারি আত্মায়।।

(জ্ঞানতাপস ভাষাবিজ্ঞানী ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর গ্রন্থ ‘নবী করীম হযরত মুহম্মদ দ.’ থেকে)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।