বৌদ্ধধর্মের উত্থান ও পতন

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নাদভী ।।

আদি বৌদ্ধধর্ম ছিলো অপেক্ষাকৃত উন্নত ও সংহত একটি ধর্ম এবং তার অনুসারীর সংখ্যাও ছিলো বিপুল।

কিন্তু একপর্যায়ে বৌদ্ধধর্ম তার স্বভাবসরলতা ও প্রাণ-উচ্ছলতা হারিয়ে ফেলে। ব্রাহ্মণ্যধর্মের ‘বিশ্বাস ও সংস্কার এবং দেবতা ও অবতার’ গ্রহণ করে বৌদ্ধধর্ম আসলে নিজের অস্তিত্বই শেষ করে দিয়েছে। উগ্র ও হিংস্র ব্রাহ্মণ্যবাদ বৌদ্ধধর্মকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, তার স্বকীয়তা ও বৈশিষ্ট্য বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি। বস্তুত, বৌদ্ধধর্ম তখন হয়ে পড়েছিলো মূর্তিপূজারই ধর্ম। পৃথিবীর যেখানে বৌদ্ধধর্ম গিয়েছে, মূর্তি ও প্রতিমা সঙ্গে গিয়েছে। বুদ্ধের অনুসারীরা যত দেশে তাদের অধিবাস গড়েছে, সেখানে বুদ্ধের অসংখ্য প্রতিমা ও ভাস্কর্য নির্মাণ করেছে। তাদের ধর্মীয় জীবন ও নাগরিক সভ্যতা বলতে গেলে প্রতিমা-সংস্কৃতি দ্বারাই আচ্ছন্ন ছিলো, যা বৌদ্ধধর্মের উন্নতির যুগে বিকাশ লাভ করেছিলো।

বৌদ্ধধর্মের প্রাচীন রাজধানী তক্ষশীলার যাদুঘর পরিদর্শনে যারাই যায়, তারা ঐসব মূর্তি ও প্রতিমা দেখে অবাক হয়ে পড়ে যা প্রাচীন বৌদ্ধ জনপদ থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বের হয়েছে। এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, বৌদ্ধধর্ম ও সভ্যতা তখন হয়ে পড়েছিলো একান্তই প্রতিমাসর্বস্ব। ডক্টর গোস্তাভ লী বোন বৌদ্ধ ভবন-প্রাসাদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ অবলোকন করে এ সিদ্ধান্তেই উপনীত হয়েছেন। Indian Civilization বা ভারতবর্ষের সভ্যতা (উর্দূ অনুবাদ, তামাদ্দুন-ই-হিন্দ) গ্রন্থে তিনি বলেন, “বৌদ্ধধর্মের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটন করার জন্য বৌদ্ধসভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ অধ্যয়ন করা আবশ্যক। বইয়ের পাতা থেকে আসল সত্য উদ্ধার করা কিছুতেই সম্ভব নয়। ইউরোপীয় লেখক-গবেষকগণ যে তথ্য ও তত্ত্ব আমাদের হযম করাতে চান তা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদির মাধ্যমে প্রমাণিত চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাদের দাবী হলো, বৌদ্ধধর্ম হচ্ছে নিরিশ্বরবাদী ধর্ম, অথচ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন প্রমাণ করছে যে, বাস্তবে বৌদ্ধধর্ম হচ্ছে প্রতিমাপূজা ও বহুউপাস্যবাদী ধর্মের পুরোধা।”

একটি ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসের শিক্ষক প্রফেসর ইশ্বর টোপা বলেন, “বৌদ্ধধর্মের ছায়ায় যে ব্যবস্থা ও দর্শন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে তাতে ছিলো বহু অবতার ও মূর্তিপূজার ছড়াছড়ি। বৌদ্ধভ্রাতৃসঙ্ঘের পরিবেশ-পরিমণ্ডল বারবার পরিবর্তিত হয়েছে এবং তাতে নব নব বৈচিত্র্যের প্রকাশ ঘটেছে।”  (উর্দূভাষায় রচিত হিন্দুস্তানী তামাদ্দুন)

ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পণ্ডিত জওয়াহির লাল নেহরুও বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন। The Discovery of India গ্রন্থে বৌদ্ধধর্মের বিকৃতি ও ক্রমাবনতি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “ব্রাহ্মণ্যবাদ গৌতম বুদ্ধকে ঈশ্বরের অবতাররূপে উপস্থাপন করেছিলো; এমনকি স্বয়ং বৌদ্ধধর্মও এ বিষয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুগমন করেছিলো। আর বৌদ্ধভ্রাতৃসঙ্ঘ বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়ে বিশেষ কতিপয় গোষ্ঠীর স্বার্থসিদ্ধির আখড়ায় পরিণত হয়েছিলো। সেখানে নিয়ম ও শৃঙ্খলার কোন অস্তিত্ব ছিলো না। উপাসনাব্যবস্থায় জাদু ও কুসংস্কারের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছিলো। ভারতবর্ষে সুদীর্ঘ একহাজার বছর পর্যন্ত উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করার পর একসময় বৌদ্ধধর্মের অবনতি ও সঙ্কোচন শুরু হয়।”

তখন বৌদ্ধধর্মের যে রুগ্ণদশা হয়েছিলো তার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরেছেন Mrs Rhys Davids. তিনি বলেন, (যেমন বিখ্যাত দার্শনিক স্যার রাধাকৃষ্ণন তার ‘ভারতীয় দর্শন’ গ্রন্থে এর বরাত দিয়ে লিখেছেন), “এ সকল রুগ্ণ চিন্তাদর্শন গৌতম বুদ্ধের নৈতিক শিক্ষার উপর এমনভাবে ছায়া বিস্তার করেছিলো যে, একসময় তা বুদ্ধের অনুসারীদেরও দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। শেষে অবস্থা এমন হলো যে, একেকটি চিন্তা ও দর্শন আত্মপ্রকাশ করে এবং কিছুকালের জন্য মানুষের মনমস্তিষ্ক আচ্ছন্ন করে রাখে। তারপর ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং অন্য একটি মতবাদ বা চিন্তাধারা তার স্থান দখল করে নেয়। উন্মেষ, বিকাশ ও বিলোপের এ ধারা চলতেই থাকে, এমনকি মানবমস্তিষ্কের এসকল চটকদার উদ্ভাবন ধর্মের সমগ্র পরিমণ্ডলেই গভীর অন্ধকার হয়ে ছেয়ে যায়, আর ধর্মের প্রবর্তকের সহজ, সরল ও সমুচ্চ নৈতিক শিক্ষা নানারকম সূক্ষ্ম জটিল দার্শনিক আলোচনার আড়ালে হারিয়ে যায়।” (The Discovery of India, p. 201-203)

সামগ্রিকভাবে বৌদ্ধধর্ম ও ব্রাহ্মণ্যবাদ দু’টোই অবক্ষয়ের শিকার হয়ে পড়ে এবং তাতে জঘন্যরকমের প্রথা ও কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটে। অবশেষে বৌদ্ধধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদে এমনভাবে একীভূত ও দ্রবীভূত হয়ে যায় যে, উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করাই কঠিন হয়ে পড়ে।

বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস ও গৌতম বুদ্ধের জীবনী যারা লিখেছেন, তাদের কাছে বৌদ্ধধর্মে ঈশ্বরচিন্তা ও স্রষ্টায় বিশ্বাসের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত সংশয় ও বিতর্কের বিষয়রূপেই রয়ে যায়। ফলে তাদের কেউ কেউ হতবাক হয়ে প্রশ্ন রেখেছেন, এমন একটি বিরাট ধর্ম নিছক কতিপয় নীতিশিক্ষার দুর্বল বুনিয়াদের উপর প্রতিষ্ঠিত হলো কিভাবে, যাতে ঈশ্বরচিন্তার কোনো স্থান নেই! আত্মশুদ্ধি, প্রবৃত্তি-দমন, সদগুণ অর্জন এবং নির্বাণ লাভের বিভিন্নমুখী কিছু সাধনা ছাড়া আর কিছুই তো নেই এ ধর্মের!

গ্রন্থ : মুসলিম উম্মাহর পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হল?

অনুবাদ : মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।