মাত্র তেত্রিশ কোটি দেবতা যাদের!

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নাদভী ।।

হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ বেদে দেবতাদের সংখ্যা ছিল মাত্র তেত্রিশ, খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতকে যার অকল্পনীয় সংখ্যাস্ফিতি পৌঁছে গেল তেত্রিশ কোটিতে। কল্পনা করুন, তেত্রিশ থেকে তেত্রিশ কোটি!

যেকোন সুন্দর, আকর্ষণীয়, অভিনব ও বিদ্ঘুটে বস্তু এবং জীবনের প্রয়োজনীয় যেকোন উপকরণ উপাস্য দেবতার মর্যাদা লাভ করেছে। এভাবে মূর্তি ও প্রতিমা এবং দেবী ও দেবতার সংখ্যা সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

তাদের উপাস্যের তালিকায় যেমন আছে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও বৃক্ষলতা, তেমনি আছে অসংখ্য জড়বস্তু ও খনিজ পদার্থ; আছে ছোট বড় হাজারো পশু-প্রাণী, এমনকি লিঙ্গপূজা পর্যন্ত বাদ পড়েনি।

পাহাড়-পর্বতও উপাস্যরূপে বরিত হয়েছে এই সুবাদে যে, তাদের কোনো কোনো দেবতা তাতে বসবাস করেছেন। আর গঙ্গা হলো তাদের মা, যা স্নানকারীর সমস্ত পাপ মোচন করে। কারণ গঙ্গা উৎসারিত হয়েছে ‘মহাদেব’-এর মাথার জট থেকে।

‘গোমাতা’রও তারা পূজা করে। এমনকি গোবর ও গোচনা হচ্ছে তাদের দৃষ্টিতে পরম পবিত্র পদার্থ। এছাড়া তাদের উপাস্যের তালিকায় রয়েছে কতিপয় ঐতিহাসিক ও কাল্পনিক ব্যক্তিত্ব। হিন্দুবিশ্বাস মতে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃতিক ঘটনায় স্বয়ং ভগবান তাদের মাঝে এসে উপস্থিত হয়েছেন।

এভাবে এই সুপ্রাচীন ধর্ম কিছু কল্পকথা, অলীক কাহিনী, আজগুবি চিন্তাবিশ্বাস ও পূজা-অর্চনার সমাহারে পরিণত হয়েছে, যার স্বপক্ষে না আল্লাহ্‌ কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেছেন, না কোনো যুগের জ্ঞান ও যুক্তি তা সমর্থন করেছে। ড. গোস্তাভ লী বোন ‘ভারতবর্ষের সভ্যতা’ গ্রন্থে লিখেছেন –

“পৃথিবীর অন্যান্য জাতির মধ্যে হিন্দুজাতি এদিক থেকে ব্যতিক্রম যে, উপাসনার জন্য তাদের কোনো না কোনো বাহ্যিক আকৃতির উপস্থিতি অপরিহার্য। যদিও বিভিন্ন যুগে ধর্মসংস্কারকগণ হিন্দুধর্মে একত্ববাদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছেন, কিন্তু তা ছিলো নিষ্ফল প্রচেষ্টা। বৈদিক যুগের হিন্দু হোক, কিংবা এ যুগের, তারা প্রকৃতির ছোট বড় সবকিছুরই পূজা করে থাকে। যা কিছু তাদের বুদ্ধির অগম্য এবং যা কিছু তাদের নিয়ন্ত্রণাতীত (এবং যা কিছু কোনো না কোনভাবে তাদের আকৃষ্ট করে) সেগুলোই তাদের দৃষ্টিতে উপাসনার উপযুক্ত। হিন্দু ব্রাহ্মণ ও দার্শনিকদের এমন সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে যা তারা একত্ববাদ প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যয় করেছেন, এমনকি উপাস্য দেবতার সংখ্যা তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টাও পণ্ডশ্রমে পর্যবসিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ তাদের শিক্ষা শুনেছে, হয়ত গ্রহণও করেছে, কিন্তু কার্যত এই তিন উপাস্য সংখ্যায় বেড়েই চলেছে এবং প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুতে ও শক্তিতে তারা কোনো না কোনো উপাস্যকে দেখতে পেয়েছে।”

আমরা যে যুগের আলোচনা করছি তখন মূর্তি ও প্রতিমানির্মাণশিল্প অভাবনীয় উন্নতি লাভ করেছিল, আর ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে তার চরমোৎকর্ষ ঘটেছিল এবং অতীতের যেকোন সময়কে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। রাজা থেকে প্রজা, সমাজের সর্বস্তরেই ছিল মূর্তিপূজার অপ্রতিহত প্রভাব, এমনকি বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মও মূর্তিপূজা অস্বীকার করার উপায় খুঁজে পায়নি। বরং ধর্মের অস্তিত্ব রক্ষা ও প্রচার-প্রসারের স্বার্থে তাদেরও এর আশ্রয় নিতে হয়েছে।

মূর্তিপূজা ও প্রতিমা-শিল্পের প্রভাব ও উৎকর্ষ তখন কোন পর্যায়ে ছিল তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় প্রখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন শাঙ-এর বিবরণ থেকে, যিনি ৬৩০ থেকে ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতবর্ষ পরিভ্রমণ করেছেন। রাজা হর্ষবর্ধন (৬০৬-৬৬৪) যে বিরাট রাজকীয় উৎসব অনুষ্ঠান করেছিলেন, তার বিবরণ দিতে গিয়ে পরিব্রাজক হিউয়েন শাঙ লিখেছেন –

“সম্রাট হর্ষবর্ধন কনৌজে এক বিরাট উৎসবসভার আয়োজন করলেন। তাতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ধর্মের বিপুলসংখ্যক পুরোহিত ও ধর্মীয় পণ্ডিত অংশগ্রহণ করেন। সম্রাট হর্ষবর্ধন গৌতম বুদ্ধের একটি স্বর্ণমূর্তি তৈরি করে পঞ্চাশ হাত উঁচু এক বিশাল স্তম্ভের ওপর তা স্থাপন করেন এবং অপেক্ষাকৃত ছোট একটি মূর্তি নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রায় বের হন। সম্রাট হর্ষবর্ধন স্বয়ং বুদ্ধমূর্তির পাশে অবস্থান গ্রহণ করে ছত্রদণ্ড বহন করেন। আর সম্রাটের মিত্র রাজা কামরূপ (ঝালর দুলিয়ে) ‘মাছি-নিবারণের’ দায়িত্ব পালন করেন।”

সম্রাট হর্ষবর্ধনের পরিবার ও সভাসদবর্গের ধর্মপরিচয় সম্পর্কে হিউয়েন শাঙ লিখেছেন –
তাদের কেউ ছিলো শিবের পূজারী, কেউ বৌদ্ধধর্মের অনুসারী; কেউ সূর্যদেবতার পূজা করতো, কেউ করতো বিষ্ণুপূজা। প্রত্যেকের স্বাধীনতা ছিল নির্দিষ্ট কোনো একটি দেবতার কিংবা সর্বদেবতার উপাসনা করার।

এদিকে প্রাচীনকাল থেকেই যৌনতা ও কামকেলি ছিল ভারতবর্ষের ধর্ম ও সমাজ-সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সম্ভবত আর কোনো দেশ, ধর্ম ও সমাজে যৌনতা ও কামচর্চার এমন ছড়াছড়ি নেই, যেমনটি রয়েছে ভারতবর্ষের ধর্ম ও সমাজ-সংস্কৃতির গভীরে। ব্রহ্মার বিভিন্ন গুণের অভিপ্রকাশ, সত্যযুগের ঘটনা-মহাঘটনা এবং ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বরহস্য সম্পর্কে যেসব কাহিনী হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত এবং হিন্দুসমাজে আলোচিত হয়ে আসছে, তদুপরি দেব-দেবী এবং দেবতা ও মানবীদের কামলীলার যে অশ্লীল বিবরণ রয়েছে তাতে যে কেউ কানে আঙ্গুল দেবে এবং লজ্জায় মাথা নীচু করতে বাধ্য হবে। ধর্মানুরাগী মানুষ যখন ভক্তি-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে এসবের চর্চা করে তখন অবচেতনভাবে তাদের মনমানস ও আবেগ-অনুভূতিতে এর কী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া হতে পারে তা তো বলাই বাহুল্য।

আরো চমকপ্রদ বিষয় এই যে, হিন্দুধর্মের প্রধান উপাস্য শিবের বীভৎস লিঙ্গমূর্তি স্থাপন করা হয় এবং নারী-পুরুষ ও যুবক-যুবতী একত্রে শিবলিঙ্গের পূজা করে। হিন্দুধর্মে লিঙ্গপূজার গুরুত্ব এবং পূজারীদের লিঙ্গভক্তি সম্পর্কে আলোচনাপ্রসঙ্গে ডক্টর গোস্তাভ লী বোন বলেন –

“প্রতিমা ও প্রতীক এবং মূর্তি ও স্থূল আকৃতির প্রতি হিন্দুদের অনুরাগ সীমাহীন। ধর্ম তাদের যাই হোক না কেন, আচার-অনুষ্ঠান তারা নিষ্ঠার সাথে পালন করে থাকে। তাদের মন্দির ও পূজাঘর অসংখ্য উপাস্য বস্তুতে পরিপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে অগ্রগণ্য হলো লিঙ্গ ও যোনি, যা সঙ্গম ও যৌনতার ইঙ্গিতবহ। অশোকস্তম্ভকেও সাধারণ হিন্দুরা লিঙ্গপ্রতীক বলে বিশ্বাস করে। যেকোন শঙ্কু ও ত্রিকোণ আকৃতিই তাদের কাছে পূজ্য ও ভক্তিযোগ্য।”

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের বর্ণনামতে কতিপয় হিন্দু সম্প্রদায়ের পুরুষেরা নগ্ন নারীদেহের এবং নারীরা নগ্ন পুরুষদেহের পূজা করতো। (দয়ানন্দ সরস্বতী, সত্যার্থ প্রকাশ, পৃ. ৩৪৪)

মন্দির এবং উপাসনালয়ের সেবায়েত, পুরোহিত ও পাণ্ডাদের লাম্পট্য কোনো কোনো সময় এমনই চরমে পৌঁছে যে, দেবতার সেবাদাসীদেরকে তারা যৌনদাসীরূপে ব্যবহার করে। এমনকি মন্দিরে আগত পূজারিণীদের সতীত্ব-সম্পদও তাদের দ্বারা লুণ্ঠিত হয়। বহু উপাসনালয় শাব্দিক অর্থেই হয়ে পড়ে পাপাচারের আখড়া। লম্পট ও পশুরা তাদের লাম্পট্য ও পাশবিকতা চরিতার্থ করার জন্য সেখানে সুযোগের সন্ধানে থাকে এবং বিভিন্নভাবে তাদের যৌনলালসা মেটায়।

এই যদি হয় মন্দির ও দেবালয়ের অবস্থা, যা গড়েই উঠেছে উপাসনা ও পূজা-অর্চনার উদ্দেশ্যে, তাহলে রাজার রাজপ্রাসাদ ও ধনীর রঙমহলের চালচিত্র কী হতে পারে?! সেখানে তো নগ্নতা ও অশ্লীলতার রীতিমত মহড়া চলতো! নাচগানের জলসায় মদের নেশায় সবাই যখন চুর, তখন লজ্জা ও লোকলজ্জার তো কোন বালাই থাকতো না। সম্ভ্রম ও হায়া-শরম হয়তো নিজেই তখন মুখ লুকোবার জায়গা খুঁজে পেত না। এভাবে সমগ্র দেশ ভেসে গিয়েছিল পাপাচার ও অবাধ যৌনতার তোড়ে এবং উভয় লিঙ্গের নৈতিকতা ও চরিত্রে নেমে এসেছিল বিরাট ধস।

এই ভোগলালসা ও ইন্দ্রীয় পূজার সম্পূর্ণ সমান্তরালে আধ্যাত্মিক সাধনা ও যোগ-তপস্যার ধারাও হিন্দু সমাজে লক্ষ্য করা যায়। তবে তাতেও থাকে বাড়াবাড়ি ও সীমা-লঙ্ঘনের চরম প্রবণতা।

মোটকথা, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেশ, ধর্ম ও সমাজ এ দুই প্রান্তিকতায় এমনভাবে বিভক্ত যে, সুস্থ চিন্তা ও মধ্যপন্থার কোথাও কোনো অবকাশ নেই।

কতিপয় ব্যক্তি ও সাধু-সন্ন্যাসী আধ্যাত্মিক সাধনা ও আত্মদমনের কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন, পক্ষান্তরে সাধারণ জনপদ ভেসে চলে প্রবৃত্তিপূজা ও ভোগলালসার প্রবল স্রোতে।

অনুবাদ : মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।