মূর্তি, ভাস্কর্য এবং চিত্রের বিরুদ্ধে বৌদ্ধধর্ম

মুহসিনুদ্দীন মাহমূদ ।।

বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তন করেছেন সিদ্ধার্থ গৌতম; যিনি এখন গৌতম বুদ্ধ বা বুদ্ধ নামেই বেশি পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে তাঁর শিক্ষা ও উপদেশকে কেন্দ্র করে এ ধর্মের উদ্ভব ঘটে। সিদ্ধার্থের জন্ম ৫৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে; নেপালের সীমান্তবর্তী রাজ্য কপিলাবস্তুতে।

বুদ্ধ নিজেকে কখনো ঈশ্বর, অবতার বা উপাস্য রূপে উপস্থাপন করেননি। তিনি কোনো দেবদেবীর উপাসকও ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সত্যান্বেষী মানুষ। জীবনের অর্থ ও তাৎপর্যকে খুঁজেছেন তিনি। অতঃপর মানুষকে সরল, অনাড়ম্বর জীবন যাপনের দীক্ষা প্রদান করেছিলেন।

নিশ্চিতভাবে বুদ্ধ ছিলেন তাঁর নিজের বা যেকোন মূর্তি নির্মাণের এবং চিত্র অঙ্কনের বিরোধী। বুদ্ধ নিজেই সুস্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে যেন কোনরূপ মূর্তি বানিয়ে বা চিত্র এঁকে উপস্থাপন করা না হয়। (দিঘা নিকায়া)

“Due to the statement of the Master in the Dighanikaya disfavouring his representation in human form after the extinction of body, reluctance prevailed for some time.” Also “Hinayanis opposed image worship of the Master due to canonical restrictions.” R.C. Sharma, in ‘The Art of Mathura, India’, Tokyo National Museum 2002, p.11
(https://bn.wikipedia.org/wiki/বৌদ্ধধর্মেরইতিহাস#cite_ref-24)

তবে যে আমরা দেখতে পাই বুদ্ধের মূর্তি দিয়ে বৌদ্ধ ধর্মস্থানগুলো ভরে ফেলা – এটা কিভাবে হলো? বৌদ্ধ ধর্মে প্রথম পূজা শুরু হয় মূর্তির নয়, ভাস্কর্যের। কী বা কেমন সেই ভাস্কর্য? ‘স্তূপ, ঢিবি বা গাদা’। বুদ্ধের বিনা অনুমতিতে; তাঁর মৃত্যুর পরে।

বুদ্ধ মৃত্যুর পর তাঁর দেহাবশেষ একটি সরল স্তূপ আকারে সমাধিস্থ করার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু সমাধি-স্তূপের ওপর কোনো সৌধ নির্মাণ করতে বলেননি; স্তূপপূজা করার কোনো অনুমতিও তিনি দেননি। বলা হচ্ছে, তাঁর মহাপরিনির্বাণের পর দেহাবশেষ ৮ ভাগ করে স্তূপ আকারে ৮টি পৃথক অঞ্চলে সমাধিস্থ করা হয়। প্রথমে শুধুই শ্রদ্ধার সাথে তাঁর কথা স্মরণ করার জন্য মানুষ এই সমাধিগুলিতে গিয়েছে। কিন্তু কালক্রমে রীতিমতো আচার-অনুষ্ঠানসহ স্তূপপূজা শুরু হয়ে যায়। আর সেটি ঐ আটটি স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। নানা অঞ্চলে নতুন নতুন স্তূপ এবং স্তূপকে কেন্দ্র করে জৌলুসপূর্ণ সৌধ তৈরি করে বৌদ্ধরা সেসবের পূজায় লিপ্ত হয়ে পড়েন।

প্রাথমিক বৌদ্ধ স্তূপ

এ বিষয়ে ড. প্রণব কুমার বড়ুয়া লিখেছেন, “বৌদ্ধ স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন হলো বৌদ্ধ স্তূপ। বুদ্ধের অস্থি বা ব্যবহৃত বস্তু রক্ষা করার জন্যই প্রথমে স্তূপের পরিকল্পনা করা হয়। … বৌদ্ধরা স্তূপকে পবিত্র মন্দিরের ন্যায় মনে করতো এবং পরবর্তীকালে তারা স্তূপকে বন্দনা এবং পূজা অর্চনা করতে শুরু করে।”
(বাংলাদেশের বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি, পৃষ্ঠা ১৭৫)

বুদ্ধের প্রথম নরত্বারোপমূলক উপস্থাপনার বা মূর্তির হদিস পাওয়া যায় গ্রীক ঔপনিবেশিক শহর আলাসান্দ্রা’র (বর্তমান কাবুলের উত্তরে অবস্থিত) গ্রীক-বৌদ্ধ শাসনামলে; যার সূচনা হয়েছিল ১৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।

এই মূর্তিনির্মাণের পিছনে ছিল তাদের বৌদ্ধধর্ম বরণের পূর্ববর্তী গ্রীক সংস্কৃতির প্রভাব। তারাই প্রথম বুদ্ধমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। যা তারা করেছিল তাদের পূর্ববর্তী ধর্মের সূর্যদেবতা অ্যাপোলো অথবা ইন্দো-গ্রীক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ব্যাক্ট্রিয়ার প্রথম দেমেত্রিওস-এর শারীরিক গঠন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে। এভাবে তারাই প্রথম মূর্তির মাধ্যমে বুদ্ধের একটা ভৌত বৈশিষ্ট্য গঠন করে।

মূলত দুইকাঁধ-ঢাকা কাপড় পরিহিত বুদ্ধের যে মূর্তি আমরা দেখতে পাই, তা প্রাচীন গ্রীক-রোমান সাম্রাজ্যে পরিহিত এক ধরনের গ্রীক ঐতিহ্যগত পোশাক টোগা ও হিমাশনের সমতুল্য বলে অনেক ইতিহাসবেত্তা মনে করেন। এছাড়া বুদ্ধের কোঁকড়ানো চুল এবং উষ্ণীষ (মাথার উপর ডিম্বাকৃতি চুলের ঝুঁটি) মূলত ভাষ্কর্য বেলভেদের অ্যাপোলো এর অনুকরণে রূপায়িত হয়েছে বলে মনে করা হয়।

(গ্রেকো-বৌদ্ধ আন্তঃক্রিয়া, উইকিপিডিয়া, https://bn.wikipedia.org/wiki/বৌদ্ধধর্মেরইতিহাস#cite_ref-25)

এরপর বুদ্ধমূর্তি তৈরির চল শুরু হয়ে যায়। অথচ আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, এ বিষয়ে বুদ্ধের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ছিল।

প্রথম বুদ্ধমূর্তি বিষয়ে লিখতে গিয়ে নোবেল চৌধুরী প্রজ্ঞা লিখেছেন, “বৌদ্ধ শাস্ত্র পাঠে জানা যায়, একসময় রাজা প্রসেনজিৎ বুদ্ধকে প্রশ্ন করেছিলেন, ভগবান, আপনার অবর্তমানে কাকে পূজা করলে আপনার পূজা হবে? সর্বজ্ঞ বুদ্ধ প্রত্যুত্তরে ভাষণ করেছিলেন, আমার অবর্তমানে বোধিবৃক্ষকে পূজা করলে আমার পূজা হবে। তখনো ভগবান বুদ্ধ মূর্তি নির্মাণে মত দেননি।”

“কিংবদন্তি অনুসারে, গৌতম বুদ্ধ তিন মাসের জন্য তাবতিংসে তার মা ও ঋদ্ধিমান দেবতাদের অভিধর্ম দেশনা করতে গিয়েছিলেন। এদিকে বুদ্ধের অবর্তমানে বুদ্ধ ভক্ত রাজা প্রসেনজিৎ চন্দন কাঠের একটি বুদ্ধমূর্তি তৈরি করে বুদ্ধের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। বুদ্ধের আগমনের সাথে সাথে সেই মূর্তিটিও সরিয়ে নেয়া হয়।”
(https://nivvanatv.net/বুদ্ধ-মূর্তি-সাম্য-মৈত্র : জানুয়ারি ৫, ২০১৮)

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি গৌতম বুদ্ধ যে বৌদ্ধধর্ম রেখে গিয়েছিলেন, তা ছিল মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে। তিনি তাঁর মূর্তি নির্মাণ বা চিত্র অঙ্কনেই নিষেধাজ্ঞা দিয়ে গেছেন, পূজা তো দূরের কথা। তাঁর মহাপরিনির্বাণের অনেক পরে তাঁর সমাধিস্থল ভ্রমণকারী মানুষ স্তূপপূজা শুরু করেন।

আরো কয়েকশ বছর পর বৌদ্ধধর্মের বিকৃতি সাধন করে গ্রীক অনুকরণে বুদ্ধের মূর্তিপূজা শুরু করা হয়।

২টি মন্তব্য

  1. MashaaAllah, Jajhakallah, Barakallah

    1. Author

      ওয়া ইয়্যাকুম!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।