হিন্দুসমাজে বিধবাবিবাহ : তিক্ত সূচনা

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।।

কলিকাতার অন্ত:পাতী পটলডাঙ্গানিবাসী শ্রীযুত (শ্রীযুক্ত) বাবু শ্যামাচরণ দাস নিজ তনয়ার বৈধব্য দর্শনে দুঃখিত হইয়া মনে মনে সঙ্কল্প করেন, যদি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা ব্যবস্থা দেন, পুনরায় কন্যার বিবাহ দিব।

তদনুসারে তিনি সচেষ্ট হইয়া বিধবাবিবাহের শাস্ত্রীয়তাপ্রতিপাদক এক ব্যবস্থাপত্র সংগ্রহ করেন। উহাতে কাশীনাথ তর্কালঙ্কার, শ্রীযুত ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন, রামতনু তর্কসিদ্ধান্ত, ঠাকুরদাস চূড়ামণি, হরিনারায়ণ তর্কসিদ্ধান্ত, মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ প্রভৃতি কতকগুলি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের স্বাক্ষর আছে।

কাশীনাথ তর্কালঙ্কার মহাশয় এতদ্দেশে সর্বপ্রধান স্মার্ত (স্মৃতিশাস্ত্রজ্ঞ) ছিলেন। শ্রীযুত ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন ও শ্রীযুত রামতনু তর্কসিদ্ধান্ত প্রধান স্মার্ত বলিয়া গণ্য। তর্কসিদ্ধান্ত ভট্টাচার্য্য মঙ্গলানিবাসী দত্ত বাবুদিগের বাটীর (বাড়ির) সভাপণ্ডিত। শ্রীযুত ঠাকুরদাস চূড়ামণি ও শ্রীযুত হরিনারায়ণ তর্কসিদ্ধান্তও এতদ্দেশের প্রসিদ্ধ পণ্ডিত এবং শ্রীযুত রাজা কমল কৃষ্ণ দেবের সভাসদ। শ্রীযুত মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশও বহুজ্ঞ পণ্ডিত বলিয়া গণ্য। ইনি সুপ্রসিদ্ধ শ্রীযুত বাবু প্রসন্নকুমার ঠাকুরের সভাসদ। ইঁহারা সকলেই ঐ ব্যবস্থায় স্ব স্ব নাম স্বাক্ষর করিয়াছেন।

কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় এই, এক্ষণে প্রায় সকলেই বিধবাবিবাহের বিষম বিদ্বেষী হইয়া উঠিয়াছেন। ইঁহারা পূর্বেই কী বুঝিয়া বিধবাবিবাহ শাস্ত্রসম্মত বলিয়া ব্যবস্থাপত্রে স্ব স্ব নাম স্বাক্ষর করিয়াছিলেন; আর, এক্ষণেই বা কী বুঝিয়া বিধবাবিবাহ অশাস্ত্রীয় বলিয়া বিদ্বেষ প্রদর্শন করিতেছেন, তাহার নিগূঢ় মর্ম ইঁহারাই বলিতে পারেন।

এ স্থলে ইহাও উল্লেখ করা আবশ্যক, শ্রীযুত বাবু শ্যামাচরণ দাসের সংগৃহীত ব্যবস্থা শ্রীযুত মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশের নিজের রচিত এবং ব্যবস্থাপত্র বিদ্যাবাগীশের স্বহস্তলিখিত। কিছু দিন পরে, যখন ঐ ব্যবস্থাপত্র উপলক্ষে বিচার উপস্থিত হয়, তখন শ্রীযুত ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন বিধবাবিবাহের শাস্ত্রীয়তাপক্ষ রক্ষার নিমিত্ত নবদ্বীপের প্রধান স্মার্ত শ্রীযুত ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন ভট্টাচার্য্যের সহিত বিচার করেন এবং বিচারে জয়ী স্থির হইয়া এক জোড়া শাল পুরস্কার প্রাপ্ত হন।

এক জন পরিশ্রম করিয়া ব্যবস্থার সৃষ্টি করিয়াছেন, আর এক জন বিরোধী পক্ষের সহিত বিচার করিয়া ঐ ব্যবস্থার প্রামাণ্য রক্ষা করিয়াছেন। কিন্তু কৌতুকের বিষয় এই যে, ইঁহারা উভয়েই এক্ষণে বিধবাবিবাহ অশাস্ত্রীয় বলিয়া সর্বাপেক্ষা অধিক বিদ্বেষ প্রদর্শন করিয়া থাকেন।

শ্রীযুত বাবু শ্যামাচরণ দাস বিষয়ী লোক, শাস্ত্রজ্ঞ নহেন। তিনি শ্রীযুত ভবশঙ্কর বিদ্যারত্ন প্রভৃতি পূর্বোক্ত ভট্টাচার্য্য মহাশয়দিগকে ধর্মশাস্ত্রের মীমাংসক জানিয়া তাঁহাদের নিকট শাস্ত্রানুযায়িনী ব্যবস্থা প্রার্থনা করিয়াছিলেন এবং তাঁহারাও সেই প্রার্থনা অনুসারে ব্যবস্থা দিয়াছেন। যদি বিধবাবিবাহ বাস্তবিক অশাস্ত্রীয় বলিয়া তাঁহাদের বোধ থাকে, অথচ কেবল তৈলবটের (ব্যবস্থা দেওয়ার জন্য স্মার্ত পণ্ডিতকে যে অর্থ দেওয়া হয়) লোভে শাস্ত্রীয় বলিয়া ব্যবস্থা দেওয়া হইয়া থাকে, তাহা হইলে যথার্থ ভদ্রের কর্ম করা হয় নাই। আর, যদি বিধবাবিবাহ বাস্তবিক শাস্ত্রসম্মত কর্ম বলিয়া বোধ থাকে এবং সেই বোধ অনুসারেই ব্যবস্থা দেওয়া হইয়া থাকে, তাহা হইলে এক্ষণে বিধবাবিবাহ অশাস্ত্রীয় বলিয়া তদবিষয়ে বিদ্বেষ প্রদর্শন করাও যথার্থ ভদ্রের কর্ম হইতেছে না।

যাহা হউক, আক্ষেপের বিষয় এই যে, যাঁহাদের এইরূপ রীতি, সেই মহাপুরুষেরাই এ দেশে ধর্মশাস্ত্রের মীমাংসাকর্তা। তাঁহাদের বাক্যে ও ব্যবস্থায় আস্থা করিয়াই এ দেশের লোকদিগকে চলিতে হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।