আমাদের সহমর্মিতার দীনতা : একটি ঘটনা

মাওলানা মুহাম্মাদ কালীম সিদ্দিকী ।।

ঝিনঝানার (ভারতের একটি এলাকার নাম) পাশের গ্রামের কোনো এক বাসিন্দা। চিনিমিলের ঠিকাদার। সে কোথাও যাচ্ছিলো। পথিমধ্যে দেখলো দাফনের জন্য এক মুসলমানকে লোকেরা নিয়ে যাচ্ছে। তার দেখার কৌতূহল হলো। দেখে সে খুবই প্রভাবিত হলো। সে দেখলো কিভাবে ইজ্জত ও সম্মানের সাথে অত্যন্ত সুরক্ষিত কামরায় রাখা হয়। ফিরতি পথে দেখলো কিছু হিন্দু একটি লাশ জ্বালাতে নিয়ে যাচ্ছে। সে দেখলো মৃতকে আগুন লাগানো হয়েছে। আগুন জ্বলে যখন লাশটি কোঁকড়ে গিয়ে বসার মতো হয়ে গেল, তখন তাকে সোজা করতে লাঠিপেটা করা হলো। আর তার মাথা ফাটানো হলো। এই করুণ দৃশ্যে তার মনে প্রচণ্ড আঘাত লাগলো।

চিনির মিলে যখন সে ফিরে আসলো, তখন দেখতে পেল মুসলমান মজুররা একত্রে একটি পাত্রে মিলেমিশে মহব্বতের সাথে খাবার খাচ্ছে। অপরদিকে কিছু হিন্দু মজুর একে অপরের দিকে পিঠ দিয়ে এমনভাবে আহার করছে, যাতে কারো মুখের বাতাসও না লাগে। সে বুঝে ফেললো।

আল্লাহ্‌র রহমতে হেদায়াতের ফয়সালা হয়ে গেল। সে নিজের গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে গেল। তার কাছে মুসলমান হওয়ার আরযি পেশ করলো। তিনি ভয়ে না করে দিলেন। তিনি তাকে ঝিনঝানার মাদরাসায় যেতে বললেন। বেচারা ঝিনঝানায় গেল। মাদরাসার লোকেরা দাঙ্গাহাঙ্গামার ভয়ে নিষেধ করে দিলেন। তারা স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে যেতে পরামর্শ দিলেন। লোকটি বিশেষভাবে সফর করে সেখানে গেল। ঐ ব্যক্তিও একই আশঙ্কায় অস্বীকার করলো। তিনি তাকে দিল্লি জামে মসজিদে যেতে পরামর্শ দিলেন।

বেচারা অত্যন্ত নিরাশ হলো। এ অবস্থায় দিল্লি যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাল। সেখানে এক মুসলমান হোটেল মালিক তার অস্থিরতা দেখে কারণ জানতে চাইলো। সে কাঁদতে লাগলো। পুরো ঘটনা বললো। সাথে বললো, মুসলমানরা আল্লাহ্‌কে ভয় করে না। আর সবকিছুকেই ভয় করে।

হোটেল মালিক বললো, জোলাতে (ভারতের মুজাফফরনগর জেলার একটি গ্রামের নাম) ইজতেমা হচ্ছে। ওখানে অনেক জামা’আত এসেছে। তুমি সেখানে চলে যাও। সেখানে কেউ না কেউ তোমাকে কালেমা পড়িয়ে দেবে। সে জোলাতে পৌঁছল। সেখানে একটি মাদরাসা আছে। সেখানকার এক শিক্ষক আমার ঠিকানা দিলেন।

দেখুন! আল্লাহ্‌র কী শান। জুম’আর দিন ছিল। কতিপয় বন্ধুকে নিয়ে কোথাও জুম’আর নামায পড়ার কথা। সকাল থেকেই চেষ্টা চলছিল। কিন্তু গাড়ি বিকল হয়ে গিয়েছিল। কাথুলী থেকে মিস্ত্রী ডেকে নতুন পার্টস লাগানো হলো। তবুও গাড়ি ঠিক হলো না। আমি বন্ধুদের বললাম, মনে হচ্ছে কোনো আল্লাহ্‌র বান্দার আকাঙ্ক্ষা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

জুম’আর নামাযের জন্য গোসল করে ঘর থেকে বের হলাম। ঐ বেচারা হাজির হলো। আমার সামনে দাঁড়িয়ে বড় আবেগভরা কণ্ঠে বলতে লাগলো, মাওলানা সাহেব! আমি মুসলমান হতে চাই। আপনি যদি মুসলমান করতে চান, তো করে নিন। আর না হয়তো আপনিও না করে দিন। আমার চাই একটি ‘কোঠা’।

আমাদের জেলায় এরকম ভাষা ব্যবহার হয়ে থাকে। সে ‘কোঠা’ বলে কবর বুঝাচ্ছিল। আমি তার আবেগ বুঝতে পারলাম। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ভাই আমার! দাঁড়িয়ে যদি কালেমা পড়তে চাও, পড়। বসার ইচ্ছা থাকলে বসে পড়। সে বসে গেল। কালেমা পড়ালাম। দারুন আনন্দিত হলো। জুম’আর নামাযের পর চলে গেল।

যাবার বেলা সে বলছিল, “লালার মিলে যেতে হবে। আসার সময় লালা বাধা দিচ্ছিল। বলছিল, তুমি রসের শিরা তৈরি করে যাও। আরে, আমারতো কোঠা দরকার!”

দেখুন! এ আল্লাহ্‌র বান্দার আকাঙ্ক্ষা। আমাদের সহমর্মিতার দীনতা, উদাসীনতা আর ভীতির কারণে সে কী পরিমাণ পেরেশান হয়েছে!

অনুবাদ : মাওলানা মুজীবুর রহমান কাসেমী
সম্পাদনা : মাওলানা নাজমুদ্দীন

 3,244 total views,  4 views today


মন্তব্য (০ টি)

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না