আমার ইসলাম বরণের অভিযাত্রা : ১

মাওলানা সাইফুর রহমান ।।

আমরা খাগড়াছড়ির বাড়িতে থাকতাম। বাবা শংকর ঘোষ একজন পশু-চিকিৎসক। তাঁর কর্মস্থল কুমিল্লা। আমরা ছিলাম হিন্দু সনাতন ধর্মের অনুসারী। কালীপূজা, দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মীপূজা – এসব পূজার সময়ে বাবা-মা-ভাই-বোন সবাই মিলে মন্দিরে যেতাম। ঠাকুর পূজা পরিচালনা করতেন। মাটির পাত্রে ধূপধোঁয়া আর দেবীমূর্তির সামনে কলা, সাগু, চিড়া, দুধ – এসব প্রসাদ। সামনে সারিবাঁধা মোমবাতি, আগরবাতি জ্বলতো। ঠাকুর আমাদের হাতে ফুলপাতা তুলে দিলে আমরা সেই অর্ঘ নিয়ে করজোরে মানুষেরই তৈরি দেবীকে প্রণতি জানাতাম।

স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালে আমি লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলি। বাবা-মায়ের সম্মতিতে কাছাকাছি মুসলিম একটা দোকানে কাজ খুঁজে নিলাম। কসমেটিকসের দোকান। দোকান মালিক আবুবকর সিদ্দিক পরহেজগার মানুষ। তাঁকে ভালো লাগে। কাজ করতে করতে তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক গাঢ় হতে থাকে। এক পর্যায়ে দুপুরবেলা, যখন বেচাকেনা হতো না, তিনি আমাকে নিয়ে নিয়মিত বসতে শুরু করলেন। সুন্দর সুন্দর আলোচনা করতেন তিনি। সাহাবাদের বিভিন্ন ঘটনা শোনাতেন। হিন্দুধর্মের অসারতা সম্পর্কেও এক-আধটু বুঝিয়ে বলতেন। তবে সরাসরি ইসলাম গ্রহণের কথা বলতেন না। তাঁর সুন্দর ব্যবহার, তাঁর কথারাজি, তাঁর কাছে শোনা চমৎকার ঘটনাগুলো আমার কচিমনে গভীর রেখাপাত করতো।

আবুবকর ভাইয়েরই পরামর্শে মূর্তিপূজায় লোক-দেখানো অংশ নিতাম; কিন্তু হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়ে গিয়েছিল ইসলামের প্রতি।

এভাবে পাঁচ বছর আমি আবুবকর ভাইয়ের দোকানে কাজ করি। এরপর তাঁর দোকান ছেড়ে অন্য দোকানে কাজ নিই। কিন্তু সুযোগ মিললেই তাঁর কাছে যাওয়া-আসা করতে থাকি। তিনিও আমাকে তাঁর ভাণ্ডার থেকে আরো অনেক কথা, অনেক ঘটনা শোনাতে থাকেন। কাজ ছাড়ার পরও কেন তাঁর কাছে যাওয়া-আসা করি – এ নিয়ে আমার আব্বা বাড়ি আসলেই আমাকে গালাগালি করতেন।

এভাবে আবুবকর ভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্ক ৬/৭ বৎসর গড়ালে একদিন ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ ব্যক্ত করি। তিনি হয়তো এমন একটা দিনের জন্য এত বছর অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু আমি নিজে থেকে আবেদন করার পর তিনি এ নিয়ে আরো ভাবলেন। তিনি আমাকে বরিশালে চরমোনাইর মাহফিলে পাঠালেন।

বাসায় আমাকে না পেয়ে আব্বা আবুবকর ভাইয়ের প্রতি সন্দেহ করলেন। তিনি তাঁকে চাপ দিলেন যে, তাঁর নামে তিনি মামলা করবেন। তখন আবুবকর ভাই লোক পাঠিয়ে মাহফিলের তৃতীয় দিন আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনলেন। আব্বার জেরার মুখে আমি নিজ থেকে জানালাম না কোথায় গিয়েছিলাম। বলি, এমনি একটু ঘুরতে বের হয়েছিলাম আরকি! বকাঝকা শোনা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকলো ঘটনা।

আমি আবুবকর ভাইকে বলি আমাকে ইসলাম গ্রহণের এবং নতুন করে লেখাপড়া শুরুর ব্যবস্থা করে দিতে। তখন তিনি আমাকে কালেমা শেখালেন এবং কয়েকটি সূরা মুখস্থ করিয়ে দিলেন। কালেমা তিনি শেখানোর মতো করেই পড়িয়েছেন। বলেছেন, দেখ, ইসলাম গ্রহণের সুযোগ হওয়ার আগে তুমি মারাও যেতে পার। কখন জীবন শেষ হয়ে যায়, বলা যায় না। তাই ইসলামের এই কালেমা শিখে রাখলে আল্লাহ্‌র কাছে উসিলা তো পেশ করতে পারবে। সঙ্গে তিনি আমাকে তিন চিল্লার জন্য তাবলীগে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে এটাকেই পড়াশুনা হিসাবে নিতে বললেন। কিন্তু আমার আর তাবলীগে যাওয়া হয়নি, তিনিও কিভাবে আমার ইচ্ছা পুরা করবেন, তা নিয়ে ভাবতে থাকলেন। এই অবস্থায় আরো ১/২ বছর কেটে গেল।

এ সময় আব্বার চোখ থেকে আমার ইসলামের প্রতি অনুরাগ আড়াল করতে পূজা-অর্চনাতেও যেতে থাকি। কিন্তু মন অস্থির ইসলাম গ্রহণের জন্য এবং আবার লেখাপড়া শুরু করার জন্য।

এমন সময় চট্টগ্রাম থেকে মূসা সাহেব নামের একজন দা’ঈ অমুসলিমদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর উদ্দেশে আমাদের এলাকায় সফরে আসেন। তিনি বিভিন্নজনের সাথে এ সম্পর্কে কথা বলতে বলতে আবুবকর ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। আবুবকর ভাই তাঁকে আমার সংবাদ জানালেন। মূসা সাহেব আমাকে ইসলাম গ্রহণের এবং লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে দিতে আশ্বাস দিলেন। তবে তাঁরা দুজন আমার বয়স আঠারো না হওয়ায় বোধহয় চিন্তিত ছিলেন। অন্যদিকে বাড়িতে আমার আম্মা অসুস্থ থাকায় আমিও মূসা সাহেবের সাথে চলে যেতে দোটানায় ছিলাম।

এই ইতঃস্তত করে সময় গড়াতে থাকলো। তখনই ঘটলো জীবনের কঠিন একটি ঘটনা।

আমার বড় বোন রুমা রাণী ঘোষ বিয়ের দেড় বছর পর সন্তান প্রসবকালে মারা গেলেন। সৎকারের উদ্দেশে আমার বোনকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়। সবার সাথে আমিও যাই। বোনকে হারিয়ে তখন আমার চোখজুড়ে কান্না ঝরছে। এ সময় দেখি সৎকারের নামে আমার বোনের মুখে ভগ্নিপতি আগুন লাগিয়ে দিল। বড় ভাইও আগুন দিল। আপুর শরীর দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করলো। চামড়া-গোশত পুড়ে খসে খসে পড়তে থাকলো। এরপর হাড় বেরিয়ে গিয়ে ফেটে এদিক-সেদিক ছুটতে শুরু করলে শ্মশানের কর্মীরা বাঁশ দিয়ে আপুকে পেটাতে শুরু করলো। এসব দেখে আমার মনে ঘৃণা আর ক্ষোভ ফেনিয়ে উঠতে লাগলো। গভীর শোকে পাথর হয়ে গেলাম। হিন্দুধর্মের প্রতি টান আমার ভেতরে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকলো না।

এবার আমার দোটানা ভাব কেটে গেছে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। এভাবে আর পড়ে থাকা নয়। আমাকে বেরিয়ে পড়তে হবে। দু’হাত বাড়িয়ে ইসলামের আলোকে বরণ করার জন্য। আবুবকর ভাইকে মনের অবস্থা জানালাম। তিনি মূসা সাহেবের সাথে কথা বললেন। ঠিক হলো আমি চট্টগ্রামে মূসা সাহেবের বাসায় চলে যাব। আবুবকর ভাই একদিন আমাকে বাসে তুলে দিলেন। খাগড়াছড়ি থেকে মানিকছড়ি এসে নামলাম। সেখানে অপেক্ষমাণ মূসা সাহেব এবং আবদুল হাই নদভী সাহেব। তাঁরা দুজন আমাকে নিয়ে ফটিকছড়িতে পৌঁছলেন। মূসা সাহেবের বাসায় উঠে প্রথমেই গোসল করে নিলাম। মূসা সাহেব আমাকে কালেমা পড়ালেন। ইসলাম গ্রহণের পরপরই আমি নতুন নাম উপহার পেলাম – সাইফুর রহমান। এরপর তাঁদের সঙ্গে একসাথে নামায পড়লাম।

মূসা সাহেবের বাসায় একদিন থাকলাম। তারপর তিনি আমাকে তাঁর বাসা থেকে দূরে একটা মাদরাসায় নিয়ে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু আব্বা আমাকে খুঁজতে খুঁজতে ফটিকছড়িতে আমার অবস্থানের কথা জেনে গেলেন। তিনি ফটিকছড়ির প্রতিটি মাদরাসায় আমার সন্ধান করবেন মনস্থ করলেন।

ওই সময় আমার চোখে অসুখ ছিল। একজন উস্তাদ আমাকে ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে ফিরছিলেন। পথে একটা বাস থেকে নেমেই দেখি অন্য একটা বাসের পিছনের দিকের আসনে আমার আব্বা বসে আছেন। তিনিও আমাকে দেখে ফেলেছেন। তখন পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমার উস্তাদ এবং আমি দুজন আলাদা হয়ে যাই। আব্বা পিছনের আসন থেকে বাসের গেইট পর্যন্ত পৌঁছার আগেই আমি ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলাম। তিনি আমাকে খুঁজে পেলেন না।

যাহোক মাদরাসায় ফিরে আসার পর সব শুনে উস্তাদরা চিন্তিত হলেন এ জন্য যে, আমার বয়স তখনো আঠারো পূর্ণ হয়নি এবং আমার এফিডেভিটও হয়নি। তাঁরা আমাকে মাদরাসায় রাখা নিরাপদ মনে না করে মূসা সাহেবকে ফোন করলেন আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মূসা সাহেব আমাকে মাদরাসা থেকে নিয়ে গেলেন। তিনি আর আমাকে চট্টগ্রামে না রেখে একজন লোকসহ ঢাকায় পাঠিয়ে দিলেন মাওলানা আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলীর (রাহ.) কাছে।

ঢাকায় নেমে আমরা সরাসরি বায়তুল মোকাররমে এসে ইসলামিক ফাউন্ডেশন অফিসে ওমর আলী সাহেবের সাথে দেখা করলাম। আগেই মূসা সাহেব ওমর সাহেবকে জানিয়ে রেখেছিলেন। হযরত আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে বললেন, তুমি তো নওমুসলিম না, তুমি আমাদের হারানো ভাই। তোমার জন্ম ইসলামের ওপরে। তোমার বাবা-মা তোমাকে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছিল, এখন তুমি আবার আমাদের মাঝে ফিরে এসেছো। তিনি সেখানে আমাকে বিভিন্নজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

অফিস সময় শেষে তিনি আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে গেলেন। বাসায় নিয়ে তিনি আমাকে অনেক আদর-আপ্যায়ন করলেন। যতদূর মনে পড়ে সেইদিন ছিল বৃহস্পতিবার। মাঝে শুক্রবার বাদে শনিবার সকালে তিনি আবার আমাকে নিয়ে তাঁর অফিসে আসলেন। এরপর তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন বাসাবো আবুজর গিফারী (রাদি.) কমপ্লেক্সে। ঠিক হলো দিনের বেলা হযরতের সাথে তাঁর অফিসে অবস্থান করে রাতে বাসাবোতে থাকবো। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেলে তিনি আমার এক চিল্লা তাবলীগে যাওয়ার ব্যবস্থা করলেন।

চিল্লায় গিয়ে আমি ঈমান এবং ইবাদতের অনেককিছু শিখেছি। ইসলাম গ্রহণের পরপর এই চল্লিশ দিনের প্রশিক্ষণ ছিল খুব মূল্যবান। পরবর্তী সময়ে ইসলামী জীবন যাপনের জন্য এই চিল্লা আমার পাথেয় হয়ে গেল।

চিল্লা থেকে ফিরে আসার পর দেখলাম কমপ্লেক্সে মাদরাসাতুল হুদার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ওমর আলী সাহেব আমাকে এখানে তুলে দিলেন মুদীর মাওলানা আবদুর রায্‌যাক নদভী সাহেবের হাতে। তখন থেকে আমার নিয়মিত পড়াশুনা শুরু হলো।

আমার হৃদয় ঝিনুকের মতো উন্মুখ হয়েছিল একফোঁটা বৃষ্টির জন্য। মুক্তা জমাবো বলে। আমি মনেপ্রাণে কামনা করছিলাম আলোকিত মানুষের একটু হাতছানি। কেননা আমি অনুভব করছিলাম অন্ধকারের মধ্য দিয়ে জীবনের দুর্গম পথে চলতে হলে আলোকনির্দেশের প্রয়োজন।

ইসলামকে যতই জানছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। ভালো লাগছে এমন সুন্দর একটা জীবন লাভ করে। আমি আবুবকর ভাই, মূসা সাহেব, ওমর আলী (রাহ.) এবং আবদুর রায্‌যাক নদভী সাহেবের ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না। আল্লাহ্‌ তাঁদেরকে উত্তম পুরস্কারে ভূষিত করবেন আশা করি।

অনুলিখন : মুহসিনুদ্দীন মাহমূদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।