জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।।

[ মানব-সৃষ্টির সূচনায় পৃথিবী ছিল শত-শতাংশ মানবিক পৃথিবী। মানুষের আদি পিতা-মাতা আদম-হাওয়া (আলাইহিমুস সালাম) যেমন নিজেরা পারস্পরিক সুন্দর শান্তিময় জীবন যাপন করেছেন, তেমনি আল্লাহ্‌র হুকুমে সন্তানদেরকেও শান্তিময় জীবনের শিক্ষা প্রদান করেছেন। কিন্তু তাঁদেরই এক সন্তান কাবিল কুফরি করে ভ্রাতৃ-হত্যা দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের সূত্রপাত ঘটায়।

হিন্দুধর্ম ইসলামের মতো মানব-সৃষ্টি-কালীন প্রাচীন কোনো ধর্ম নয়, নয় বিশ্ব-ধর্মও। তবে ইসলাম ধর্মের বর্ণনার মতো এই ধর্মের আলোচনাতেও দেখা যায়, ধর্মের মূল শিক্ষাকে উপেক্ষা করে কিছু মানুষ অমানবিক চর্চার প্রবর্তনে এগিয়ে যায়। তেমনি একটি বর্বর কুপ্রথা হিন্দুদের মধ্যে দুই হাজার বছর ধরে টিকে ছিল ‘সতীদাহ’ বা ‘সহমরণ’ নাম দিয়ে। এই প্রথায় মৃত স্বামীকে ‘দাহ’ করার সাথে সাথে তার জীবিত স্ত্রীকেও একইসঙ্গে পুড়িয়ে হত্যা করা হতো। এ ক্ষেত্রে বলা হতো, স্বামীর সাথে সাথে তার স্ত্রী বা স্ত্রীগণও নিজেদের সতীত্ব রক্ষা করে স্বর্গে গমন করলেন।

মুঘল এবং ইংরেজ শাসনকালে এই কুপ্রথা তুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। বারবার এতে বাদ সাধে উগ্রবাদীরা। দুঃখজনকভাবে এই উগ্রবাদীদেরই একজন ছিলেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আসুন পড়ে দেখি তার এই কবিতাটি। এটি তিনি হিন্দুনারীদের সহমরণে উৎসাহ দিয়ে আয়োজিত মঞ্চ-নাটকের জন্য লিখেছিলেন। – মুহসিনুদ্দীন মাহমূদ ]

জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।।

জ্বল্‌ জ্বল্‌ চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ
পরান সঁপিবে বিধবা বালা।
জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন
জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা।

শোন্‌ রে যবন, শোন্‌ রে তোরা,
যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে
সাক্ষী র’লেন দেবতা তার
এর প্রতিফল ভুগিতে হবে।

দেখ্‌ রে জগৎ, মেলিয়ে নয়ন,
দেখ রে চন্দ্রমা, দেখ রে গগন,
স্বর্গ হতে সব দেখো দেবগণ
জ্বলদ্‌-অক্ষরে রাখো গো লিখে।

স্পর্ধিত যবন, তোরাও দেখ রে,
সতীত্ব রতন করিতে রক্ষণ
রাজপুত সতী আজিকে কেমন
সঁপিছে পরান অনলশিখে।।

[ যবন : ম্লেচ্ছ; তুচ্ছার্থে অনার্য জাতি। বিধর্মী। অহিন্দু। বিদেশি। মুসলিম। কদাচারী। পাপিষ্ঠ। ]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।