হিন্দুসমাজের নিষ্ঠুর শ্রেণীভেদ ও বর্ণপ্রথা

সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নাদভী ।।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ও জনপদে শ্রেণীভেদ ও বর্ণপ্রথা অবশ্যই ছিলো, কিন্তু ভারতবর্ষের মত আর কোথাও এমন কঠোর, নিষ্ঠুর বর্ণপ্রথা ও শ্রেণীভেদ ছিলো না। বস্তুত এটা ছিলো মানবতার প্রতি চরম অবমাননা, যা ভারতবর্ষে শুধু সামাজিকভাবেই নয়, ধর্মীয়ভাবেও স্বীকৃত ছিলো, যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে, এখনও চলছে। ভারতীয় সমাজের এই জাতিভেদ এবং পেশাগত বিভক্তি ও শৃঙ্খল-বন্ধনের সূচনা হয়েছিলো বৈদিক যুগের শেষভাগে, একই পেশা ও কর্মে বংশপরম্পরায় আবদ্ধ থাকার বাধ্যবাধকতা থেকে। বহিরাগত আর্যরা তাদের বংশমর্যাদা ও জাতকৌলীন্য অক্ষুণ্ণ রাখার এবং বিজেতারূপে নিজেদের তাপ ও প্রতাপ বজায় রাখার স্বার্থে এই শ্রেণীভেদ ও বর্ণপ্রথা অপরিহার্য মনে করেছিলো। ডক্টর গোস্তাভ লী বোন বলেন –

‘বৈদিক যুগের শেষভাগেই আমরা দেখতে পেলাম, বিভিন্ন পেশা ও জীবিকা মোটামুটি পৈত্রিক রূপ ধারণ করে চলেছে এবং শ্রেণীভেদ প্রথার গোড়াপত্তন হয়ে গিয়েছে, যদিও তখনো তা পূর্ণাঙ্গ কাঠামো লাভ করেনি।

বৈদিক আর্যদের মধ্যে এ ধারণা পাকাপোক্ত হয়ে গিয়েছিলো যে, বিজিত জাতি ও জনগোষ্ঠীর মিশ্রণ থেকে নিজেদের সনাতন বংশধারাকে রক্ষা করতে হবে। পরবর্তী পর্যায়ে এই সংখ্যালঘু বিজেতা সম্প্রদায় যখন পূর্বদিকে অগ্রসর হলো এবং দেশীয় জনগোষ্ঠীর এক বিরাট অংশের উপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেললো, তখন এর প্রয়োজনীয়তা আরো তীব্র হলো এবং বিধানপ্রণেতাদের জন্য এটা বিবেচনায় আনা জরুরি হয়ে পড়লো।

বংশধারা রক্ষা ও বিলুপ্তির রহস্য ততদিনে তারা বুঝে গিয়েছিলো। ভালোভাবেই তাদের জানা হয়ে গিয়েছিলো যে, সংখ্যালঘু বিজেতা জাতি নিজেদের বংশস্বাতন্ত্র্য যদি রক্ষা না করে, তাহলে খুব দ্রুত তারা বিজিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিলীন হয়ে যায়, নামচিহ্ন পর্যন্ত আর বাকি থাকে না।’

তবে এই বর্ণপ্রথাকে সুবিন্যস্ত ও পূর্ণাঙ্গ বিধানরূপে প্রবর্তনের কৃতিত্ব এককভাবে মনুজীর। যিশুখ্রিস্টের জন্মের তিনশ বছর পূর্বে ভারতবর্ষে যখন ব্রাহ্মণ্য সভ্যতার পূর্ণ উত্থান ঘটে, তখন ঐ সভ্যতার পৃষ্ঠপোষকতার উদ্দেশ্যে মনুজী ভারতীয় সমাজের জন্য একটি নতুন বিধান প্রবর্তন করেন এবং তাতে নাগরিক ও রাজনৈতিক নিয়মবিধি তৈরি করেন, যা সমগ্র দেশ ও জনপদ মেনে নেয়। ফলে ভারতীয় সমাজ-সভ্যতায় সেটা সার্বজনীন আইন ও ধর্মীয় বিধানরূপে স্বীকৃতি লাভ করে। এটাই বর্তমানে মনুশাস্ত্র বা মনুসংহিতারূপে পরিচিত।

মনুসংহিতায় দেশের জনগোষ্ঠীকে চারটি পৃথক শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। যথা –

(১) ব্রাহ্মণ, অর্থাৎ ধর্মীয় পুরোহিত শ্রেণী
(২) ক্ষত্রিয়, অর্থাৎ যোদ্ধাশ্রেণী
(৩) বৈশ্য, অর্থাৎ কৃষি ও বাণিজ্যজীবী শ্রেণী
(৪) শূদ্র, অর্থাৎ সেবকশ্রেণী, যাদের নির্ধারিত কোন পেশা নেই; যাবতীয় নিম্নশ্রেণীর পেশার মাধ্যমে উচ্চবর্ণের সেবা করে যাওয়াই যাদের একমাত্র কাজ।

মনুসংহিতায় বলা হয়েছে –

সংসারের মঙ্গলার্থে ব্রহ্মা ব্রাহ্মণকে আপন মুখ হতে, ক্ষত্রিয়কে আপন বাহু হতে, বৈশ্যকে আপন ঊরু হতে এবং শূদ্রকে আপন পদযুগল হতে সৃষ্টি করেছেন। সংসারকে রক্ষাকল্পে ব্রহ্মা স্বয়ং তাদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্ম বণ্টন করে দিয়েছেন। ব্রাহ্মণের দায়িত্ব হলো বেদ শিক্ষাদান, দেবতাদের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য প্রদান, দান গ্রহণ ও প্রসাদ বিতরণ।

ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য হলো যোদ্ধাধর্ম পালন, অর্থাৎ মানুষকে যাবতীয় উপদ্রব ও অরাজকতা হতে রক্ষা করা, বেদ অধ্যয়ন করা, দান প্রদান, নৈবেদ্য অর্পণ এবং কামসংযম।

বৈশ্যের কর্তব্য হলো গবাদি পশু পালন, বাণিজ্য ও কৃষিকাজ, বেদ পাঠ, দান প্রদান ও নৈবেদ্য অর্পণ।

আর শূদ্রকে ব্রহ্মা একটিমাত্র আদেশ করেছেন, অর্থাৎ উপরের সম্প্রদায়ত্রয়ের সেবায় আত্মনিয়োগ এবং সর্ব-উপায়ে তাদের সন্তুষ্টি অর্জন। (মনুসংহিতা, ১ম অধ্যায়)

ব্রাহ্মণসম্প্রদায়ের চরম আধিপত্য : মনুসংহিতার বর্ণবিধান ব্রাহ্মণকে এত বেশী অধিকার ও বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছে যে, তারা প্রায় দেবমর্যাদায় অভিষিক্ত হয়ে পড়েছে। মনুসংহিতার মতে –

ব্রাহ্মণসম্প্রদায় হলো ব্রহ্মার প্রিয়পাত্র এবং মানবকুলের সম্রাট। তাদের কাজ শুধু ধর্মের রক্ষণাবেক্ষণ। যেহেতু তারাই হলো সৃষ্টির সেরা এবং জগত-অধিপতি, সেহেতু জগতের সকল সম্পদে তাদের একচ্ছত্র অধিকার। ব্রাহ্মণ শূদ্রদাসদের যাবতীয় সম্পদ ইচ্ছামত দখল করতে পারে, এতে কোন পাপ নেই। কেননা দাসের কোন মালিকানাস্বত্ব নেই; তার সম্পদের স্বত্ব আপন মনিবের। (মনুসংহিতা, ১ম অধ্যায় এবং ৮ম অধ্যায়)

ঋগ্বেদ যে ব্রাহ্মণের মুখস্থ, সে পাপমুক্ত ব্যক্তি, যদিও পাপরাশি দ্বারা সে ত্রিলোক নাশ করে ফেলে। এমনকি কঠিনতম অভাব ও প্রয়োজনের মুহূর্তেও রাজার অধিকার নেই ব্রাহ্মণ থেকে কোনরূপ রাজস্ব বা কর গ্রহণ করার, আর রাজার কর্তব্য হলো রাজ্যের ব্রাহ্মণদেরকে ক্ষুধার কষ্ট থেকে রক্ষা করা এবং অনাহারে মরতে না দেয়া। ব্রাহ্মণ যদি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ করে তবে তার শাস্তি হবে শুধু মস্তক মুণ্ডন করা, পক্ষান্তরে অন্যদের শাস্তি হবে যথারীতি মৃত্যুদণ্ড। (মনুসংহিতা, ২য় অধ্যায় এবং ৯ম অধ্যায়)

ক্ষত্রিয়সম্প্রদায় : যদিও এরা অপর দু’টি বর্ণ বৈশ্য ও শূদ্র থেকে শ্রেষ্ঠ, কিন্তু তাদের অবস্থান ব্রাহ্মণ থেকে অনেক নীচে। মনু বলেন, দশ বছর বয়স্ক ব্রাহ্মণ বালক একজন শতায়ু ক্ষত্রিয় থেকে উত্তম, যেমন পিতা সন্তান থেকে উত্তম। (মনুসংহিতা, ১১শ অধ্যায়)

মনুসংহিতার বিধান মতে ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় যে দায়িত্ব ও মর্যাদা লাভ করেছে তা হলো, যেহেতু তারা বেদ-জ্ঞান দ্বারা নিজেদের চিন্তা ও মস্তিষ্ককে পরিপুষ্ট করেছে, সেহেতু তারা দেশের রাজা হতে পারে। শাসক, প্রশাসক, বিচারক ও সেনাপতি হতে পারে। ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় হতে রাজা মনোনীত হলে তাকে অমর্যাদা করার অধিকার নেই, হোক সে শিশু। এক্ষেত্রে বলা হবে যে, তিনি মানব, তবে রাজার মানবসত্তায় ভগবানের সত্তা মূর্ত হয়েছে।

ক্ষত্রিয়রা শান্তিকালেও সৈনিক ও যোদ্ধারূপে জীবনযাপন করবে, আর তার কর্তব্য হবে প্রথম ডাকের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হওয়া। পক্ষান্তরে রাজার কর্তব্য হবে অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা।

বৈশ্যসম্প্রদায় : বৈশ্যসম্প্রদায়ের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে মনুসংহিতায় বলা হয়েছে, বৈশ্যের কর্তব্য হলো আপন সম্প্রদায়ের কোন নারীকে বিবাহ করা। আপন পেশায় যত্নবান হওয়া এবং স্থায়ীভাবে গবাদিপশু পালন করা। আর যারা বাণিজ্য করে তাদের কর্তব্য হলো বাণিজ্যের বিধিবিধান এবং সুদব্যবস্থা উত্তমরূপে জানা, তদ্রূপ কর্তব্য হলো কৃষিজ্ঞান অর্জন করা এবং মাপ ও পরিমাপপদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি অর্জন করা। আরো কর্তব্য হলো শ্রমিকের মজুরি, মানুষের ভাষা এবং পণ্যসংরক্ষণ ও ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় জানা।

অভিশপ্ত শূদ্রসম্প্রদায় : মনুপ্রবর্তিত সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যবস্থামতে ভারতীয় হিন্দুসমাজে শূদ্র বা অচ্ছুতই হলো সর্বনিম্ন সম্প্রদায়। সমাজে তাদের অবস্থান ও মর্যাদা ইতর পশুর চেয়েও অধম। মনুশাস্ত্রের সুস্পষ্ট ঘোষণা –

শূদ্রের জন্য এটাই পরম সৌভাগ্য যে, তারা ব্রাহ্মণসেবায় নিয়োজিত হতে পারে; এছাড়া তাদের আর কোন পুণ্য ও প্রাপ্তি নেই। অর্থ উপার্জন ও সম্পদ-সঞ্চয়ের কোন অধিকার শূদ্রের নেই। কারণ তা ব্রাহ্মণের মনঃকষ্টের কারণ। শুদ্র যদি কোন ব্রাহ্মণের উপর হাত তোলে বা ক্রোধান্ধ হয়ে তাকে লাথি মারে, তাহলে তার হাত ও পা কেটে ফেলা হবে। আর যদি কোন পাপিষ্ঠ শূদ্র কোন ব্রাহ্মণের সমকক্ষে বসার ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে, তাহলে শাসকের অবশ্যকর্তব্য হবে তার পশ্চাদ্দেশে গরম লোহার দাগ দিয়ে তাকে দেশছাড়া করা। আর কোন ব্রাহ্মণকে স্পর্শ করা বা তাকে কটু কথা বলার সাজা হলো জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলা। আর যদি দাবী করে ব্রাহ্মণকে সে শিক্ষা দিতে পারে, তাহলে তার মুখে তপ্ত তেল ঢেলে দাও। কুকুর, বিড়াল, কাক, পেঁচা এবং কোন শূদ্রকে হত্যা করার প্রায়শ্চিত্ত একই সমান। (মনুসংহিতা, ৮ম অধ্যায়, ১০ম অধ্যায় এবং ১১শ অধ্যায়)

অনুবাদ : মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।